চতুর্দশ অধ্যায়- গুণত্রয় বিভাগযোগ

চতুর্দশ অধ্যায়- গুণত্রয় বিভাগযোগ

14
ভগবান উবাচ-
পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং ‌জ্ঞানমুুত্তমম্।
যজ্ জ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্বে পরাং সিদ্ধিমিতো গতাঃ।।১

অর্থ-ভগবান বললেন-আমি পুনরায় তোমাকে সমস্ত জ্ঞানের মধ্যে সর্বতম জ্ঞান সম্বন্ধেই বলব, যা লাভ করে, মুনিগন পরা সিদ্ধিরূপা ভক্তি লাভ করে ছিলেন।

ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ ।
সর্গেহপি নোপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ ।।২

অর্থ-সেই জ্ঞান আশ্রয় করলে আমার পরা প্রকৃতি, চিন্ময় জগৎ লাভকরে। তখন আর সৃষ্ঠির সময় জড় জগতে জন্মগ্রহন করে না এবং প্রলয়ে আত্মবিনাশ রুপ দূঃখ পায় না।

মম যোনির্মহদ্ ব্রহ্ম তস্মিন্ গর্ভং দধাম্যহম্‌।
সম্ভবঃ সর্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত ।।৩

অর্থ-হে ভরত প্রকৃতি সংজ্ঞক ব্রহ্ম এই জড় জগতের উৎপত্তির কারন, এবং সেই ব্রহ্মে আমি গর্ভদান করি ফলে সর্বভূতের সৃষ্ঠি হয়ে।

সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মুর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ ।
তাসাং ব্রহ্ম মহদ্ যোনিরহং জীবপ্রদঃ পিতা ।।৪

অর্থ-হে কৌন্তেয় সমস্ত যোনিতে যত মুর্তি প্রকাশিত হয় ব্রহ্মরুপ যোনিই তাদের জননী স্বরুপা এবং আমি তাদের বীজ প্রদানকারি পিতা।

সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতি সম্ভবাঃ ।
নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম ।।৫

অর্থ-হে মহাবাহো জড় প্রকৃতি থেকে সতঃ, রজঃ ,তমঃ এই তিনটি গুনের প্রকাশ হয়। জীব যখন জড়া প্রকৃতির সংর্স্পেশে আসে তখন সে তিনটি গুনের দ্বারা আবদ্ধ হয়।

তত্র সত্ত্বং নির্ম্মলত্বাং প্রকাশকমনাময়ম্ ।
সুখেসঙ্গেন বধ্নতি জ্ঞানসঙ্গেন চানঘ ।।৬

অর্থ-হে নিস্পাপ; এই তিনটি গুনের মধ্যে সত্ত্বগুন অপেক্ষাকৃত নির্ম্মল, প্রকাশক এবং পাপশুন্য। এই সত্ত্বগুন আমি সুখি এই প্রকার সুখাশক্তি এবং আমি জ্ঞানি এই প্রকার জ্ঞানা শক্তি দ্বারা আমাকে আবদ্ধ করে।

রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভবম্‌ ।
তন্নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্মসঙ্গেন দেহিনম্ ।।৭

অর্থ-হে কৌন্তেয়, অন্তহীন কামনা বাসনা থেকে রজগুণের উৎপত্তি হয় এবং রজগুনেই জীবকে সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে।

তমস্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্বদেহীনম্ ।
প্রমাদালস্যনিদ্রাভিস্তন্নিধ্নাতি ভারত ।।৮

অর্থ-হে ভারত তমগুন জীবের ভ্রান্তি উৎপাদন করে। প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রার দ্বারা তমঃগুন জীবকে আবদ্ধ করে।

সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্মানি ভারত ।
জ্ঞানমাবৃত্য তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত ।।৯

অর্থ-সত্ত্বগুন জীবকে সুখের বন্ধনে আবদ্ধ করে, রজগুন জীবকে সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে, এবং তমগুন প্রমাদের বন্ধনে আবদ্ব করে।

রজস্তমশ্চভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত ।
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা ।।১০

অর্থ-সত্ত্বগুন যখন প্রবল হয় তখন রজঃ ও তমঃগুন পরাজিত হয়। রজঃগুন যখন প্রবল হয় সত্ত্ব ও তমঃগুন পরাজিত হয়, এবং তমঃগুন যখন প্রবল হয় তখন সত্ত্ব ও রজঃগুন পরাজিত হয় এই ভাবে প্রকৃতির তিনটিগুনের মধ্যে সর্বদা আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা হয়।

সর্বদ্বারেষু দেহেহস্মিন্ প্রকাশ উপজায়তে ।
জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাদ্ বিবৃদ্ধং সত্ত্বমিত্যুত ।।১১

অর্থ-জ্ঞানের আলোকে জড়দেহের ইন্দ্রীয় রুপ দ্বারগুলিতে সত্ত্বঃ গুনের প্রকাশ অনুভুতি হয়।

লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্মণামশমঃ স্পৃহা ।
রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ ।।১২

অর্থ-হে ভরত শ্রেষ্ঠ রজঃগুনের প্রবল বর্ধিত হলে লোভ, কর্মে প্রবৃত্তি, উদ্যম, ও বিষয় ভোগের স্পৃহা বৃদ্ধি পায় ।শ্রী কৃষ্ণ ও অর্জুন

অপ্রকাশোহপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ ।
তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন ।।১৩

অর্থ-তমঃ গুনের প্রভাব বর্ধিত হলে, অপ্সানান্ধকার, প্রমাদ, মোহ উৎপন্ন হয়।

যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভূৎ ।
তদোত্তমবিদামং লোকানমলান্ প্রতিপদ্যতে ।।১৪

অর্থ-সত্ত্বগুন সম্পন্ন ব্যাক্তির দেহ ত্যাগ হইলে নির্ম্মল উচ্চতর লোক প্রাপ্ত হয়।

রজসি প্রলয়ং গত্বা কর্মসঙ্গিষু জায়তে ।
তথা প্রলীনস্তমসি মূঢ়যোনিষু জায়তে ।।১৫

অর্থ-রজোগুণসম্পন্ন ব্যাক্তির মৃত্যু হলে কর্মাসক্ত মনুষ্যকুলে জন্ম হয়; এবং তমোগুণে আবিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু হলে পশুযোনিতে জন্ম হয়।

কর্মণঃ সুকৃতস্যাহূঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলম্‌ ।
রজস্তু ফলং দুঃখ্যমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্ ।।১৬

অর্থ-সার্থিক কর্মের ফলে জীব পবিত্র হয়। রাজসিক কর্মের ফলে দুঃখভোগ হয় এবং তামসিক কর্মের ফলে অজ্ঞান অচেতনত্ব লাভ হয়।

সত্ত্বাং সংজায়তে জ্ঞানং রজসো লোভ এব চ ।
প্রমাদমোহৌ তমসো ভবতোহজ্ঞানমেব চ ।।১৭

অর্খ-সত্ত্বগুন থেকে প্রকৃত জ্ঞান, রজগুন থেকে লোভ এবং তমগুন থেকে অজ্ঞান প্রমাদ ও মোহ উৎপন্ন হয়।

উর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ ।।১৮

অর্থ-সত্ত্বগুনস্থ ব্যক্তিগন উর্ধ্বগতী লাভ করেন অর্থাৎ উচ্চতর লোকে গমন করেন; রাজসিক ব্যক্তিগন নর লোকে অবস্থান করেন; এবং তামসিক ব্যক্তিগন অধঃ পাতিত হয়ে নর লোকে গমন করেন।

নান্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি ।
গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোহধিগচ্ছতি ।।১৯

অর্থ-জীব যখন অনুভব করেন যে প্রকৃতির গুন ব্যথিত কর্মে অন্য কোন কর্তা নেই এবং পনমেশ্বর ভগবান এই সমস্ত গুনের অতিত তখন তিনি আমার পরা প্রকৃতি জানতে পারেন।

গুণানেতানতীত্য ত্রীন দেহী দেহ সমুদ্ভভবন্ ।
জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোহমৃতমশ্নূতে ।।২০

অর্থ-দেহ ধারী জীব যখন প্রকৃতির তিন গুন অতিক্রম করে জন্ম, জরারুপ দুঃখ বিমুক্ত হন, তখন তিনি ইহ জীবনেই অমৃত তত্ত্ব আস্বাদন করেন।

অর্জুন উবাচ-
কৈর্লিঙ্গৈস্ত্রীন্ গুণানেতানতীতো ভবতি প্রভো ।
কিমাচারঃ কথং চৈতাংস্ত্রীন্ গুণানতিবর্ত্ততে ।।২১

অর্থ-অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন হে প্রভু যিনি প্রকৃতির তিনটি গুনের অতীত হন তার লক্ষন কি? আর আচারন কিরকম এবং তিনি কিভাবে প্রকৃতির গুনত্রয় অতিক্রম করে।শ্রী কৃষ্ণ ও অর্জুন

ভগবান উবাচ-
প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মোহমেব চ পান্ডব ।
ন দ্বেষ্টি সম্প্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্খতি ।।২২

উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে ।
গুণা বর্ত্তন্ত ইত্যোবং যোহবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে ।।২৩

সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্ট্রাশ্মকাষ্ণনঃ ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরতুল্য নিন্দাত্মসংস্তুতিঃ ।।২৪

মানাপোমানয়োতুল্যতুল্যো মিত্রারিপক্ষয়োঃ ।
সর্বারম্ভপরিত্যাগী গুনাতীতঃ স উচ্যতে ।।২৫

অর্থ-ভগবান বলিলেন -প্রকাশ প্রবৃত্তি ও মোহ আবির্ভুত হলে যিনি দ্বেষ করেন না এবং তাদের নিবৃত্তি ও আকাঙ্খা করে না, তিনিই গুনাতিত, উদাসিনের মত অবস্থিত থেকে যিনি গুনের দ্বারা বিচলিত হন না, যিনি সুখ, দুঃখ, মাটির ঢেলা, পাথর, সোনা, প্রিয়, অপ্রিয়, নিন্দা স্তুতি ইত্যাদির প্রতি সমদৃষ্টি সম্পন্ন এবং আত্মস্বরুপে অবস্থিত হয়ে তাদের তুল্য জ্ঞান করেন, যিনি সন্মান এবং অপমানে নির্বিকার, শত্রু ও মিত্রের প্রতি পক্ষ্যপাত শুন্য,যিনি ফলভোগের উদ্দেশ্যে কর্ম না করে, কেবল ভগবানের প্রীতি সম্পাদনের জন্য কর্ম করেন তিনি গুনাতিত।

মাঞ্চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভুয়ায় কল্পতে ।।২৬

অর্থ-যিনি ঐকান্তিক ভক্তিসহকারে আমার সেবা করেন, এবং যিনি কোন অবস্থাতে অধঃপাতিত হন না, তিনিই প্রকৃতির সমস্ত গুন অতিক্রম করে ব্রহ্মভুত অবস্থায় উন্নিত হয়েছেন।

ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্যাব্যয়স্য চ ।
শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ ।।২৭

অর্থ-অমিই নির্বিশেষ ব্যহ্মের প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়। অমৃতত্ত্ব, অব্যয়ত্ব, নিত্যত্ত্ব, নিত্য ধর্ম এবং ঐকান্তিক সুখের আশ্রয় আমিই।

ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যাযাং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
গুণত্রযবিভাগযোগো নাম চতুর্দশোঽধ্যাযঃ

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

মন্তব্য করুন

সাবমিট

© বাংলাদেশ সনাতনী সেবক সংঘ | সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

Powered by Smart Technology