চতুর্থ অধ্যায়- জ্ঞানযোগ

চতুর্থ অধ্যায়- জ্ঞানযোগ

শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন

অর্জুন আপদ কালীন করনীয় জানছে শ্রীকৃষ্ণের কাছে

ভগবান উবাচ-
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্‌ ।
বিবস্বান্ মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীৎ ।। ১

অর্থ-ভগবান বললেন- অমি পুর্বে সুর্য্যদেব বিবশ্বানকে এই অব্যয় নিস্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞান যোগ বলে ছিলাম। সুর্য তা মানবজাতির জনক মনুকে বলেন এবং মনু তা ইক্ষাকুকে বলেছিলেন।

এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ ।
স কালেনহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ ।। ২

অর্থ-এই ভাবে পরম্পরের মাধ্যমে এই পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিল কিন্তু কালের প্রভাবে পরম্পরা ছিন্ন হয়েছিল এবং সেই যোগ নষ্টপ্রায় হয়েছে।

স এবায়ং ময়া তেহদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতন ।
ভক্তোহসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদত্তমম্‌ ।। ৩

অর্থ-সেই সনাতন যোগ আজ তোমাকে বললাম কারন তুমি আমার ভক্ত ও সখা তাই তুমি এই বিজ্ঞানের অতি গুরুরহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।

অর্জুন উবাচ-
অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ ।
কথমেতদ্বিজানিয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতী ।। ৪

অর্থ-অর্জুন বললেন সুর্যদেব বিবশ্বানের জন্ম হয়েছিল আপনার জন্মের অনেক পুর্বে। আপনি সৃষ্টির প্ররম্ভে তাকে এই জ্ঞান উপদেশ করেছিলেন তা আমি কিকরে জানব।

ভগবান উবাচ-
বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন ।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ।। ৫

অর্থ-ভগবান বললেন- হে পরন্তপ অর্জুন আমার এবং তোমার বহুজনম অতিত হয়েছে, আমি সে সমস্ত জন্মের কথা মনে করতে পারি তুমি তা পার না।

অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্ ।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া ।। ৬

অর্থ-যদিও আমি জন্ম রহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্ব ভূতের ঈশ্বর তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি স্বীয় মায়ার দ্বারা আমার আদি চিন্ময় রুপে যুগে যুগে অবতির্ন হই।

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজাম্যহম্‌ ।। ৭

অর্থ-হে ভরত যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভূত্থান হয় তখনই আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতির্ন হই।

পরিত্রানায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুস্কৃতম্‌ ।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে ।। ৮

অর্থ-সধুদের পরিত্রান করার জন্য এবং দুস্কৃত কারিদের বিনাশ করার জন্যএবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতির্ন হই।

জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবম্ যো বেত্তি তত্ত্বতঃ ।
ত্যাক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহজৃুন ।। ৯

অর্থ-হে অর্জুন যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম এবং কর্ম যথাযথ ভাবে জানেন তাকে আর দেহ ত্যাগ করার পর পুনরায় জন্ম গ্রহন করতে হয় না তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করে।

বীতরাগভয়ক্রোধা মন্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ ।
বহবো জ্ঞানতপসা পুতা মদ্ভাবমাগতাঃ ।। ১০

অর্থ-আসক্তি ভয় ক্রোধ থেকে মুক্ত হয়ে সম্পুর্নরুপে আমাতে মগ্ন হয়ে, একান্ত ভাবে আমার আশ্রিত হয়ে, পুর্বে বহু বহু ব্যক্তি আমার জ্ঞান লাভ করে পবিত্র হয়েছে এবং সেই ভাবে সকলেই আমার প্রীতি লাভ করিয়াছে।

যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্‌ ।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ ।। ১১

অর্থ-যে যেভাবে আমার প্রতি আত্ম সমর্পন করে, প্রপত্তি স্বীকার করে, আমি তাকে সেইভাবেই পুরুষকৃত করি। হেপার্থ সকলেই সর্বতেভাবে আমার অনুসরন করে।

কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্মনাং সিদ্ধিং যজন্ত ইহ দেবতাঃ ।
ক্ষিপ্রং হি মানুষে লোকে সিদ্ধির্ভবতি কর্মজা ।। ১২

অর্থ-এই জগতে মানুষ সকাম কর্মের সিদ্ধি কামনা করে এবং তাই তারা বিভিন্ন দেব দেবীর উপসনা করে। সকাম কর্মের ফল অতি শীগ্রই লাভ হয়।

চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুনকর্মবিভাগশঃ ।
তস্য কর্তরমপি মাং বিদ্ধ্যির্কর্তারমব্যয়ম্‌ ।। ১৩

অর্থ-প্রকির্তির তিনটি গুন এবং কর্ম অনুসারে আমি মানুষ সমাজে চারিটি বর্নবিভাগ সৃষ্টি করিয়াছি। আমিই এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।

ন মাং কর্মণি লিম্পন্তি ন মে কর্মফলে স্পৃহা ।
ইতি মাং যোহভিজানাতি কর্মভির্ন স বধ্যতে ।। ১৪

অর্থ-কোন কর্ম আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না এবং আমিও কোন কর্মফলের আকাঙ্খা করি না। আমার এই তত্ত যে জানেন তিনি কখনো সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয় না।

এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পুর্বৈরপি মুমুক্ষুভি ।
কুরু কর্মৈব তস্মাত্ত্বং পুবৈঃ পুর্বতরং কৃতম্‌ ।। ১৫

অর্থ-প্রাচিনকালে সমস্ত পুরুষেরা এই তত্ত অবগত হয়ে সকাম কর্ম পরিত্যাগ করে মুক্তি লাভ করেছেন।অতএব তুমিও সেই প্রাচিন মহাজনের মত চিন্ময় চেতনায় তোমার কর্তব্য সম্পাদন কর।

কিং কর্ম কিমকর্মেতি কবয়োহপ্যত্র মোহিতাঃ ।
তত্তে কর্ম প্রবক্ষামি যজ্ জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ ।। ১৬

অর্থ-কাকে কর্ম কাকে অকর্ম বলে তা স্থির করতে বিবেকী ব্যক্তিরাও মোহিত হন। আমি সেই বিষয় তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি। তুমি তা অবগত হয়ে সমস্ত অশুভ অবস্থা থেকে মুক্ত হও।

কর্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যঞ্চ বিকর্মণ ।
অকর্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্মনো গতিঃ ।। ১৭

অর্থ-কর্মের নিগুর তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন। তাই কর্ম বিকর্ম এবং অকর্ম সম্বন্ধে যথাযথ ভাবে জানা কর্তব্য।

কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মনি চ কর্ম যঃ ।
স বুদ্ধিমান্ মনুষ্যেসু স যুক্তঃ কৃত্স্নকর্মকৃৎ ।। ১৮

অর্থ-যিনি কর্মে অকর্ম দর্শন করেন এবং অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, তিনিই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান। সবরকম কর্মে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি চিনন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত।

যস্য সর্বে সমারম্ভাঃ কামসংকল্পবর্জিতাঃ ।
জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মাণাং তমাহুঃ পন্ডিতং বুধাঃ ।। ১৯

অর্থ-যার সমস্ত প্রচেষ্টা কাম এবং সংকল্প রহিত তিনি পুর্নজ্ঞানে অধিষ্ঠিত। জ্ঞানিগন বলেন যে তার সমস্ত কর্মের প্রতিক্রিয়া পরিশুদ্ধ জ্ঞানাগ্নি দ্বারা দগ্ধ হইয়াছে।

ত্যাক্তা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্ত নিরাশ্রয়ঃ ।
কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোহপি নৈব কিঞ্চিৎ করতি সঃ ।। ২০

অর্থ-কর্মফলের আসক্তি সম্পুর্নরুপে ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত এবং কোন রকম আশ্রয়ের অপেক্ষা যিনি করেন না, সব রকম কর্মে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি কর্ম ফলের আশায় কোনও কিছইু করেন না।

নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ ।
শরিরং কেবলং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্লিষম্‌ ।। ২১

অর্থ-এই প্রকার জ্ঞানিব্যক্তি তার মন এবং বুদ্ধিকে সর্বোতভাবে সংযত করে কার্য করেন।তিনি ফলের আশা পরিত্যাগ করে এবং প্রভূত্ত করার প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে কেবল জীবন ধারনের জন্য কর্ম করেন। এই ভাবে কর্ম করার ফলে কোন রকম পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতো বিমত্সরঃ ।
সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাহপি ন নিবধ্যতে ।। ২২

অর্থ-যিনি অনায়সে যা লাভ করেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, যিনি সুখ-দুঃখ রাগ দ্বেষ ইত্যাদি দ্বন্ধের বশীভূত হন না এবং মাত্সর্যশুন্য, যিনি কার্যের সাফল্য এবং অসাফল্যে অবিচালিত থাকেন তিনি কর্ম সম্পাদন করলেও কর্মফলের দ্বারা কখনো আবদ্ধ হয় না।

শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন

শ্রীকৃষ্ণের অর্জুনকে গীতার জ্ঞান দান

গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসাঃ ।
যজ্ঞায়চরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবলীয়তে ।। ২৩

অর্থ-জড়া প্রকৃতির গুনের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে চিন্ময় জ্ঞাননিষ্ট ব্যক্তি ভগবানের উদ্দেশ্যে সমর্পিত যজ্ঞের উদ্দেশ্যে যে কর্ম সম্পাদন করেন সে সকল কর্ম সম্পুর্নরুপে লয় প্রাপ্ত হয়।

ব্রহ্মার্পনং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্‌ ।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা ।। ২৪

অর্থ-যিনি কৃষ্ণ ভাবনায় সম্পুর্ন মগ্ন তিনি অবশ্যই চিত্জগতে উন্নিত হবেন, কারন তার সমস্ত কার্য কলাপ চিন্ময়। তার কর্মের উদ্দেশ্য চিন্ময় এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি যা নিবেদন করেন তাও চিন্ময়।

দৈবমেবাপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্যুপাসতে ।
ব্রহ্মাগ্নাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈবোপজুহ্বতী ।। ২৫

অর্থ-কোন যোগী অধীদেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার মাধ্যমে তাদের উপসনা করেন। আবার, অন্য অনেক পরম ব্রহ্মরুপ অগ্নিতে সব কিছু নিবেদন করার মাধ্যমে যজ্ঞ করেন।

শ্রোত্রাদীনিন্দ্রিয়াণ্যন্যে সংযমাগ্নিষু জুহ্বতি ।
শব্দদীন্‌ বিষয়ানন্য ইন্দ্রিয়াগ্নিষু জুহ্বতি ।। ২৬

অর্থ-কেউ কেউ মন সংযম রুপ অগ্নিতে শ্রবন আদি ইন্দ্রিয়গুলিকে আহুতি দেন আবার অন্য অনেকে ( নিয়মনিষ্ঠ গৃহস্তেরা) শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়কে ইন্দ্রিয়রুপ অগ্নিতে আহুতি দেন।

সর্বানীন্দ্রিয়কর্মাণি প্রানকর্মাণি চাপরে ।
আত্মসংযমযোগাগ্নৌ জুহ্বতি জ্ঞানদীপিতে ।। ২৭

অর্থ-মন এবং ইন্দ্রিয় সংযমের মাধ্যমে যারা আত্মজ্ঞান লাভের প্রয়াসী তারা তাদের ইন্দ্রিয় সমস্ত কার্য কলাপ এবং প্রান বায়ুর দ্বারা প্রদীপ্ত আত্মা সংযমরুপ অগ্নিতে আহুতী দেন।

দ্রব্যযজ্ঞাস্তপোযজ্ঞা যোগযজ্ঞাস্তথাপরে ।
স্বাধ্যায়জ্ঞানযজ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ ।। ২৮

অর্থ-কেউ কেউ দ্রব্য দানরুপ যজ্ঞ করেন। কেউ কেউ তপস্যারুপ যজ্ঞ করেন কেউ কেউ অষ্টাঙ্গ যোগরুপ যজ্ঞ করেন এবং অন্য অনেকে পারমার্থিক জ্ঞান লাভের জন্য বেদ অধ্যায়নরুপ যজ্ঞ করেন।

অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেহপানং তথাপরে ।
প্রাণাপানগতী রুদ্ধা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ ।
অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্ প্রানেষু জুহ্বতি ।। ২৯

অর্থ-আর যারা প্রাণায়াম চর্চ্চায় আগ্রহী তারা অপান বায়ুকে প্রাণবায়ুতে এবং প্রান বায়ুকে অপান বায়ুতে আহূতী দিয়ে অবশেষে প্রাাণ এবং অপান বয়ুর গতী রোধ করে সমাধিস্থ হন। কেউ আবার আহার সংযম করে প্রাণ বায়ুকে প্রাণবয়ুতেই আহুতী দেন।

সর্বেহপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষপিতকল্ম্ষাঃ ।
যজ্ঞশিষ্টামৃতভূজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্‌ ।। ৩০

অর্থ-তারা সকলে যজ্ঞ তত্তবিৎ এবং যজ্ঞের প্রভাবে পাপমুক্ত হয়ে তারা যজ্ঞশিষ্ট অমৃত আস্ব্বাদন করেন। তারপর সনাতন প্রকৃতিতে ফিরে যান।

নায়ং লোকোহস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোহন্যঃ কুরুসত্তম ।। ৩১
অর্থ-যজ্ঞ অনুষ্ঠান না করে কেউ এই জগতে সুখে থাকতে পারে না, সুতরাং পরলোক প্রাপ্তির পরে তাদের কি হবে ?

এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রাহ্মণো মুখে ।
কর্মজান্ বিদ্ধি তান্ সর্বানেবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে্ ।। ৩২

অর্থ-এই সমস্ত যজ্ঞই বৈদিগ শাস্ত্রে অনুমোদিত হয়েছে এবং এই সমস্ত যজ্ঞ বিভিন্ন প্রকার কর্মজাত।তা যথাযথ ভাবে জানার মাধ্যমে তুমি মুক্তি লাভ করতে পারবে।

শ্রেয়ান্ দ্রব্যময়াদ্ যজ্ঞাজ্ জ্ঞানযজ্ঞঃ পরন্তপ ।
সর্বং কর্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে ।। ৩৩

অর্থ-হে পান্ডব দ্রব্যময় যজ্ঞ থেকে জ্ঞানময় যজ্ঞ শ্রেয়- হে পার্থ সমস্ত কর্মই চিন্ময় জ্ঞানে পরিসমাপ্তি লাভ করে।

তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া ।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ ।। ৩৪

অর্থ-সদগুরু শরনাগত হয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার চেষ্টা কর। বিনম্র চিত্তে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কর এবং অকৃতিম সেবার দ্বারা তাকে সন্তুষ্ট কর তা হলে সেই তত্ত্বদ্রষ্টা পুরুষ তোমাকে জ্ঞান উপদেশ দান করবে।

যজ্ জ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পান্ডব ।
যেন ভূতান্যশেষাণি দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি ।। ৩৫

অর্থ-হে পান্ডব এইভাবে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে তুমি আর মোহগ্রস্ত হবে না। যখন জানবে সমস্থ জীবই আমার বিভিন্ন অংশ এবং তারা সকলেই আমাতে অবস্থিত এবং তারা সকলেই আমার।

শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন

শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রশ্নরত অর্জুন

অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ ।
সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি ।। ৩৬

অর্থ-তুমি যদি পাপিদের চেয়েও পাপিষ্ট হয়ে বলে গন্য হয়ে থাক, তা হলে এই জ্ঞানরুপ তরনীতে আরেহন করে তুমি দুঃখ সমুদ্র পার হতে পারবে।

যথৈধাংসি সমিদ্ধোহগ্নির্ভস্মসাৎ কুরুতেহর্জুন ।
জ্ঞানাগ্নি সর্বকর্মাণি ভস্মস্যাৎ কুরুতে তথা ।। ৩৭

অর্থ-প্রবল রুপে প্রজ্জলিত অগ্নি যেমন কাষ্টকে ভস্মস্যাত্ করে, হে অর্জুন তেমনী জ্ঞানাগ্নি সমস্ত কর্মকে দগ্ধ করে ফেলে।

ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে ।
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি ।। ৩৮

অর্থ-চিন্ময় তত্ত্ব জ্ঞানের মত পবিত্র পদার্থ এই জগতে আর নাই। এই জ্ঞান সমস্ত যোগের ফলশ্রুতি এবং ভক্তি চর্চ্চার মাধ্যমে যিনি সেই জ্ঞান আয়ত্ত করেন, তিনি কালক্রমে আত্মার পরাশক্তি লাভ করে।

শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তত্পরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।
জ্ঞানং লব্ধা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি ।। ৩৯

অর্থ-সংযতেন্দ্রিয় ও তত্পর হয়ে চিন্ময় তত্ত্বজ্ঞানে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি এইজ্ঞান লাভ করেন, সেই দিব্যজ্ঞান লাভ করে তিনি অচিরেই পরাশান্তি লাভ হন।

অজ্ঞশ্চাশ্রদ্দধ্যানশ্চ সংশয়াত্মা বিনশ্যতি ।
নায়ং লোকোহস্তি ন পরো ন সুখং সংশয়াত্মনঃ ।। ৪০

অর্থ-মুর্খ এবং শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি কখন ভগবদ্ভক্তি লাভ করতে পারে না। সন্দিগ্ধ চিত্ত ব্যক্তি ইহ লোকে সুখভোগ করতে পারে না এবং পরলোকেও সুখভোগ করতে পারে না।

যোগসংন্যস্তকর্মণং জ্ঞানসংছিন্নসংশয়ম্ ।
আত্মবন্তং ন কর্মণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয় ।। ৪১

অর্থ-অতএব হে ধনঞ্জয় যিনি নিস্কাম কর্ম যোগের দ্বারা কর্মত্যাগ করেন, জ্ঞনের দ্বারা সংশয় নাশ করেন এবং আত্মার চিন্ময় সরুপ অবগত হন তাকে কোন কর্মে আবদ্ধ করতে পারে না।

তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃত্স্তং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ ।
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোতিষ্ঠ ভারত ।। ৪২

অর্থ-হে ভারত তোমার হৃদয় যে অজ্ঞান প্রসুত সংশয়ের উদয় হয়েছে তা জ্ঞানরুপ
খড়গের দ্বারা ছিন্ন কর। যোগাশ্রয় করে যুদ্ধ করার জন্য উঠে দাড়াও।

ওঁ তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যাযাং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
জ্ঞানকর্মসংন্যাসযোগো নাম চতুর্থোঽধ্যাযঃ

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

মন্তব্য করুন

সাবমিট

© বাংলাদেশ সনাতনী সেবক সংঘ | সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

Powered by Smart Technology