আরতি’ শব্দের ব্যাখ্যা

আরতি

32147697_605676173128604_7560523277240631296_o
আরতি’ শব্দের ব্যাখ্যা
********
.“আ” অর্থে ব্যাপ্তি; “রতি” অর্থে প্রেম, ভালাবাসা ও অনুরাগ। যে মাঙ্গলিক
অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রীভগবানের নিজের প্রীতি বর্ধিত হয় অর্থাৎ তিনি ভক্তের
প্রতি প্রসন্ন বা সন্তুষ্ট হন এবং ভগবানের প্রতিও ভক্তের প্রেম, প্রীতি,
ভালবাসা, ভক্তি ও অনুরাগ বৃদ্ধি পায় তাকে আরতি বলে। অতএব আরতি
ভগবানের প্রতি ভক্তের অন্তরের গভীর ভাবভক্তি পূর্ণ একটি মহা মাঙ্গলিক
অনুষ্ঠান।
. ভগবানের প্রতি ভক্তের অন্তরের ভাব ও ভক্তির মাধ্যমে, আকুলতা-ব্যাকুলত
া প্রকাশের মাধ্যমে ও সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের মাধ্যমে, আরতির অনুষ্ঠান করা হয়
সার্থক ও সুন্দর। ভাব ও ভক্তি শূন্য আরতি তাই কেবল নাচানাচি বা অঙ্গবিক্ষেপ
ছাড়া অন্য কিছু নয়। আর ওরকম আরতির মাধ্যমে ভগবানের আশীর্বাদ পাওয়া
যায় না কিছুই। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা যুগাচার্য স্বামী
প্রণবানন্দজী মহারাজ বলেছেন, “আন্তরিক ভাবভক্তি নিয়ে প্রতিদিন পূজারতির
মাধ্যমে আমার শক্তি সকলের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। গুরু
শক্তি লাভের ইহা একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।”
. শাস্ত্রীয় পূজার বিধান সহজ নয় বরং জটিলও বলা যায়। কিন্তু আরতির অনুষ্ঠান
খুবই সহজ সাধ্য। কারণ আরতির অনুষ্ঠান কেবল মাত্র ভাব ও ভক্তির মাধ্যমে
সুসম্পন্ন হয়। যারা শাস্ত্রীয় পূজার বিধি ও মন্ত্র জানেন না তারা ভক্তি
ভাবের সাথে একমাত্র আরতির মধ্য দিয়ে সকল পূজার ফল লাভ করতে পারেন। তাই
ভাব ও ভক্তি পূর্ণ আরতির অনুষ্ঠান হলো সকল পূজার সার।শাস্ত্রীয় পূজা যদি
বিধিহীন ও মন্ত্রহীন হয়, তবে ভক্তি পূর্ণ আরতির মধ্য দিয়ে তা সম্পূর্ণতা লাভ
করে। এ প্রসঙ্গে দেবাদিদেব শিব, দেবী পার্বতীকে বলেছেন-
“মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং যৎকৃতং পূজনং হরেঃ।
সর্ব্বং সম্পূর্ণতামেতি কৃতে নীরাজনে শিবে॥”
.
অর্থঃ হে দেবী পার্বতী, শ্রীভগবানের পূজা যদি মন্ত্রহীন ও ক্রিয়াহীন হয়,
তবে নীরাজন বা আরতির মাধ্যমে তা সম্পূর্ণতা লাভ করে।
. নানা উপচারে আরতির অর্থ জানা দরকারঃ
পূর্বে বলা হয়েছে- শ্রীভগবানের প্রতি, সদ্গুরুর প্রতি অর্থাৎ আরাধ্য দেবতার
প্রতি ভক্তের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদনের মাধ্যমে আরতির অনুষ্ঠান হয়
সার্থক। কিন্তু সাধারণ
নরনারীর তীব্র আসক্তি বিষয়ের প্রতি, ভোগ বিলাসের প্রতি, কামনা ও বাসনার
প্রতি। সেই বিষয়াসক্তি ত্যাগের জন্যই তো করতে হয় পূজা-আরতির বিশেষ অনুষ্ঠান।
শাস্ত্রে বলা
হয়েছে, এ বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে পাঁচ প্রকার উপাদান থেকে। তা হলো- ক্ষিতি (মাটি),
অপ্ (জল), তেজ (অগ্নি), মরুৎ (বায়ু), ও বোম্ (আকাশ)।
.উল্লিখিত. পাঁচ প্রকার উপাদান আরতির মাধ্যমে শ্রীভগবানকে উৎসর্গ করলে,
আর কিছু
নিবেদন করতে বাকী থাকে না।
. মানুষের পাঁচ প্রকার ইন্দ্রিয়, পাঁচ প্রকার বিষয় ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যেমনঃ
.
*নাসিকা- গন্ধের প্রতি।
.
*চোখ- রূপের প্রতি।
.
*জিহ্বা- রসের প্রতি।
.
*কান-শব্দের প্রতি।
.
*ত্বক (গাত্রচর্ম)- স্পর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
.
. অর্থাৎ বিষয় ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আরতির উপচার ভগবানের উদ্দেশ্যে, সদ্গুরুর
উদ্দেশ্যে নিবেদনের মাধ্যমে উল্লিখিত পাঁচ প্রকার ইন্দ্রিয়ের, পাঁচ প্রকার বিষয়
ভোগের আসক্তি হতে মুক্ত হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করতে হয়। প্রণব মঠ
ও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ-এর আরতির নিয়মে বলা যায়-
.
(ক) ধূপ বা ধূপতি মাটি বা গন্ধের প্রতীক স্বরূপ।
ধূপ বা ধূপতির মাধ্যমে, আরতি ক’রে সদ্গুরুর নিকট নাসিকা (নাক) ইন্দ্রিয়ের ভোগ
বাসনার (বহির্জগতের গন্ধ যেমন-নানা প্রকার সুগন্ধি কস্মেটিক দ্রব্যাদি) প্রতি
আকর্ষণ মুক্ত হতে পারি- সেই প্রার্থনা জানাতে হয়। পক্ষান্তরে পবিত্র পূজার
ধূপ, ধূনা, কর্পূর প্রভৃতির গন্ধে খুশি থাকতে পারি সেই পার্থনা করতে হবে।
.
(খ) পঞ্চ প্রদীপ তেজ বা অগ্নির প্রতীক, রূপের প্রতীক। পঞ্চ প্রদীপ দিয়ে
আরতির মাধ্যমে, সদ্গুরুর নিকট চক্ষু ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনার (বহির্জগতের রূপ দর্শন
যেমন-অচিত্র, কুচিত্র, খারাপ দৃশ্য ইত্যাদি) প্রতি আকর্ষণ মুক্ত হতে পারি- সেই
প্রার্থনা জানাতে হয়। আরও প্রার্থনা জানাতে হয়, “হে ঠাকুর তোমারই রূপ
দর্শনে যেন ধন্য হতে পারি।”
.
(গ) জলশঙ্খ অপ্ বা জলের প্রতীক, রসের
প্রতীক। জল শঙ্খ দিয়ে আরতি ক’রে সদ্গুরুর নিকট জিহ্বা ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনা
(যেমন-
মাছ, মাংস প্রভৃতি খাদ্য দ্রব্য; মদ, বিড়ি, সিগারেট বা অন্যান্য মাদকদ্রব্য) থেকে
আসক্তি মুক্ত হতে পারি সেই প্রার্থনা জানাতে হয়। সেই সাথে প্রার্থনা করতে
হয়, “হে ঠাকুর, তোমার প্রতি নিবেদিত পবিত্র প্রসাদ গ্রহণ ক’রে যেন জীবনকে ধন্য
করতে পারি।”
.
(ঘ) চামর ও পাখা মরুৎ বা বায়ুর প্রতীক, স্পর্শ সুখের প্রতীক। চামর ও পাখা
দিয়ে আরতির মাধ্যমে সদ্গুরুর নিকট ত্বক ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনা (নর-নারীর একে
অপরের প্রতি কু-বাসনা নিয়ে শরীর স্পর্শ করা-বহির্জগতের স্পর্শের প্রতীক) হতে
আসক্তি মুক্ত হতে পারি- সেই প্রার্থনা জানাতে হয়। সেই সাথে আরও প্রার্থনা
করতে হয়, “হে ঠাকুর, তোমার শ্রীচরণ অভিষেক ক’রে, স্পর্শ ক’রে, যেন জীবনকে ধন্য
করতে পারি।”
.
(ঙ) বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বোম্ বা আকাশের প্রতীক। ঘণ্টা, ঢাক,
কাসর প্রভৃতি বাঁজিয়ে আরতি করার মাধ্যমে সদ্গুরুর নিকট কর্ণ ইন্দ্রিয়ের ভোগ
বাসনা (বহির্জগতের খারাপ শব্দ, পরনিন্দা, সমালোচনা, কু-সঙ্গীত প্রভৃতি
শোনার আসক্তি) হতে মুক্ত হতে পারি- সে প্রার্থনা জানাতে হয়। সেই সাথে আরও
প্রার্থনা করতে হয়- “হে ঠাকুর, তোমার পবিত্র ভজন সঙ্গীত শুনে, তোমার গুণগান
শুনে, যেন জীবনকে ধন্য করতে পারি।”
.
(চ) ত্রিশূল, তরবারি, চক্র প্রভৃতি শক্তির প্রতীক। ভিতর ও বাইরের শত্রু দমনের
প্রতীক। তাই ত্রিশূল দিয়ে বা অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে আরতি করার মাধ্যমে- ভেতরের
শত্রু (কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি রিপু ও ইন্দ্রিয়ের বিষয়াসক্তি বা ভোগ বিলাসের
আসক্তি) থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সদ্গুরু ভগবানের নিকট আন্তরিক প্রার্থনা
জানাতে হবে। সেই সাথে বাইরের শত্রু- দুষ্ট, দূর্বৃত্ত, অত্যাচারীদের হাত থেকে
নিজেদের রক্ষা করার জন্য অর্থাৎ আত্মরক্ষা করার জন্য অস্ত্র চর্চ্চা করারও
অভ্যাস করতে হবে।
.
(ছ) পুষ্প বা ফুল ভক্তি ও আত্মনিবেদনের প্রতীক। তাই পুষ্প পাত্র দিয়ে আরতি
নিবেদনের মাধ্যমে শ্রীগুরু ভগবানের নিকট প্রার্থনা জানাতে হবে, “হে আমার
প্রাণের ঠাকুর, আমার এই জীবন কুসুমটিও তোমারই শ্রীপাদপদ্মে ভক্তি অর্ঘ্য রূপে
উৎসর্গ করলাম। তুমি কৃপা পূর্বক গ্রহণ ক’রে এই দীন সন্তানকে আশীর্বাদ করো।
যেন আমার জীবনকে ফুলের মতো পবিত্র করতে পারি অর্থাৎ সৎ চরিত্রবান হতে
পারি।”
.
. এভাবে উল্লিখিত সমস্ত উপচারের আরতির মাধ্যমে- গন্ধ, রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ
প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গুলির বিষয় আসক্তি দূর ক’রে, শ্রীগুরু ভগবানের প্রতি সম্পূর্ণ
আত্মনিবেদন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভগবানের প্রতি ভক্তের আত্মনিবেদনের
মাধ্যমে ভক্তের মধ্যে
জাগ্রত হয় শুদ্ধ, পবিত্র ভগবদ্ভক্তি। আর শুদ্ধ,
পবিত্র ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে ভক্ত জন্মজন্মান্তরীণ কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত
হয়ে পরম শান্তি লাভে ধন্য ও কৃতার্থ হয়।
. সংক্ষেপে এই হলো আরতি তত্ত্ব বা আরতি-মাহাত্ম্য। পরমকরুনাময় সচ্চিদানন্দঘন
গোলোকপতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সবার মঙ্গল আর কল্যাণ করুণ।(দেবেন্দ্র)
“হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে!!”
!!জয় শ্রীকৃষ্ণ!! জয় রাধে!!
ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

মন্তব্য করুন

সাবমিট

© বাংলাদেশ সনাতনী সেবক সংঘ | সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

Powered by Smart Technology