অপরপক্ষ/পিতৃপক্ষ ও মহালয়া

অপরপক্ষ/পিতৃপক্ষ

মহালয়া
মহালয়ার পূর্ববর্তি ১৫ দিনকে বলা হয় অপরপক্ষ। কোথাও কোথাও একে পিতৃপক্ষ ও বলা হয়ে থাকে। এ সময় পূর্ব পুরুষদের জন্য শ্রাদ্ধ ও তিল তর্পন করতে হয়। বলা হয়ে থাকে যে, এ সময় পূর্বপুরুষগন সন্তানদের জল পিণ্ডের আশাই চেয়ে থাকে। তাই এ সময় তিল তর্পন করা সন্তানদের কর্তব্য।
তর্পন হল সেই কর্ম যার দ্বারা আমরা আমাদের পূর্বে মৃত দের উদ্যেশে তিল জল দিয়ে থাকি ।
তর্পন হল দুই প্রকার যথা : ১) স্নানাঙ্গ তর্পন ২) নিত্য তর্পন।
প্রতিদিন পুকুরে বা নদীতে স্নানের সময় যে তর্পন করা হয় তা স্নানাঙ্গ তর্পন। এর দ্বারা প্রতিদিনই পূর্বপুরুষ দের উদ্যেশে জল দেয়া হয়। কিন্তু আমরা এখন তা করতে অসমর্থ, তাই আমরা নিত্য তর্পন করি পিতৃপক্ষে। যা আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথির পরদিন থেকে শুরু হয় এবং মহালয়ার দিন আমাবস্যা পর্যন্ত এই কার্য করা যায় । আমাবস্যার দিন পিতৃপক্ষের শেষ।
যাদের মা বাবা মারা গিয়েছেন তাদের তর্পণ করতে হয়। সে সাথে আপনার বংশের যত অগ্রজ ব্যক্তি আছেন যারা পূর্বে মারা গেছেন তাদের নামেও তর্পন করতে হবে । শুধুমাত্র আপনার বংশের নয়, আপনার মায়ের বংশের মৃতদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হবে। বিবাহিতদের স্ত্রী বংশের মৃতদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হবে ।
অনেক প্রকার তর্পণ আছে। যেমন-
১) মনুষ্য তর্পন। ২) ঋষি তর্পন। ৩) দিব্য পিতৃতর্পন। ৪) যম তর্পন। ৫) ভীষ্ম তর্পন। ৬) বাম তর্পন। ৭) শূদ্র তর্পন।

কোন বংশে যারা মারা গিয়েছে তারা এখন কোথাই আছে তা আমরা জানি না। কেউ স্বর্গে, কেউ নরকে আর কেউ যদি খুব ভাল কাজ করে তাহলে বৈকুন্ঠ কৈলাশে অথবা আবার পূর্নজন্ম নিয়েছেন। তারা যেখানেই থাক না কেন তাদের আত্মার এক সময় জল পাবার ইচ্ছা করে। তারা তাদের বংশধর দের কাছে জল প্রার্থনা করে। সেই জন্য আমরা তর্পন করে থাকি। এতে করে তাদের আত্মার শান্তি হয়। শুধু মাত্র আমাদের পূর্বজদের নয়, দেবতা ঋষি আদি মহানব্যক্তিদের উদ্যেশেও তর্পন করতে হয় । তর্পন করলে আমাদের মধ্যে শান্তির সন্চার হয় ।
জলাশয়ে নেমে তিল সহিত মন্ত্র দ্বারা তর্পন করতে হয়। একজন অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণের শরণাপন্য হতেই হবে। ব্রাহ্মণের দক্ষিণা দিতে ভুলবেন না কিন্তু, সাধ্য থাকলে বাড়িয়ে দিবেন এতে আপনারই পূণ্য। বিভিন্ন অঞ্চলে এ সময় বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। কোথাও কোথাও মেয়ে জামাই ও ভাগিনা দের নিমন্ত্রণ করে জামা কাপড় দেয়া হয়।

মহালয়া

‘মহালয়া’ কথাটির অর্থ কি ? মহালয়াঅথবা, পিতৃপক্ষের অবসান লগ্ন বা দেবীপক্ষের পূর্ববর্তী অমাবস্যাকে ‘মহালয়া’ বলাহয় কেন ? এই ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত। ‘মহ ‘ শব্দটির দুই অর্থ পাই। ‘মহ ‘ বলতে বোঝায় পূজা, আবার ‘মহ ‘ বলতে বোঝায় উৎসব। আবার মহালয় বলতে বোঝায় মহান + আলয় = মহালয়। তার সঙ্গে স্ত্রীকারান্ত ‘আ ।মহালয় হচ্ছে পূজা বা উৎসবের আলয় বা আশ্রয়। আলয় শব্দটির একটি অর্থ হচ্ছে আশ্রয়। আন্যদিকে ‘মহালয় ‘ বলতে , ‘পিতৃলোককে ‘ বোঝায় -যোখানে বিদেহী পিতৃপুরুষ অবস্থান করছেন। তা যদি হয় তাহলে পিতৃলোককে স্মরণের অনুষ্ঠানই মহালয়া। কিন্তু তাহলে স্ত্রীলিঙ্গ হল কেন ? তাহলে পিতৃপক্ষের অবসানে, অন্ধকার অমাবস্যার সীমানা ডিঙিয়ে আমরা যখন আলোকময় দেবীপক্ষের আগমনকে প্রত্যক্ষ করি – তখনই সেই মহা লগ্নটি আমাদের জীবনে ‘মহালয়ার ‘ বার্তা বহন করে আনে । এক্ষেত্রে স্বয়ং দেবীই হচ্ছে সেই মহান আশ্রয়, তাই উত্তরণের লগ্নটির নাম মহালয়া।একটি অর্থ অনুসারে মহান আলয়টি হচ্ছে পিতৃলোক। সংবদ্য ও বেদান্ত দর্শন অনুসারে সমস্ত লোকের মধ্যে পিতৃলোকও একটি। এই পিতৃলোকে পিতৃ, ঋষি ও প্রজাপতিরা বাস করেন। তাঁদের সঙ্গেই পিতৃতর্পণের মাধ্যমে আমরা মানসিক ও আত্মিক সংযোগ স্থাপন করি, তাঁদেরই প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করি। আশ্বিন মাসের এই কৃষ্ণপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনায় যে অমাবস্যাকে আমরা মহালয়া হিসেবে চিহ্নিত করি, সেই দিনটি হচ্ছে পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সন্ধিলগ্ন। পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার মাধ্যমে এই দিনটিতে আমরা আমাদের এই মানব জীবনকে মহান করে তুলতে প্রয়াসী হই বলেই এই পূণ্যলগ্নটি আমাদের জীবনে বারবার মহালয়ারূপেই দেখা দেয়।
মহালয়া এলেই বাংলার মাটি-নদী-আকাশ প্রস্তুত হয় মাতৃপূজার মহালগ্নকে বরণ করার জন্য। কাশফুল ফুটলে শরৎ আসে, না শরৎ এলে কাশফুল ফোটে, অথবা নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসলে শরৎ আসে, না, শরৎ এলে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসে -এসব নিয়ে বিস্তর তর্ক চলতে পারে। কিন্তু মহালয়া এলেই যে দুর্গাপূজা এসে য়ায় – তা নিয়ে তর্কের কোনও অবকাশ নেই। মহালয়া এলেই সেই দেবী -বন্দনার সুরে ধ্বনিত হয় বাংলার হৃদয়ে। দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। বুকের মধ্যে জাগে আনন্দ-শিহরিত কাঁপন; এবার মা আসবেন।
সবাই নিশ্চিত মহালয়া মানে দূর্গাপূজার দিন গোনা, মহালয়ার ৬ দিন পর মহাসপ্তমি, তাই দেবিকে আমত্রন ইত্যাদি। মহালয়ার তার চেয়ে বড় গুরুত্ব আছে, সেটা কেউ কেউ জানেন, কেউ কেউ জানেন না।

মহালয়াত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবিকে আরাধনা করেছিলেন লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য আসল দূর্গা পূজা হলো বসন্তে, সেটাকে বাসন্তি পূজা বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র অকালে-অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে এই শরতের পূজাকে দেবির অকাল-বোধন বলা হয়।
সনাতন ধর্মে কোন শুভ কাজ করতে গেলে, বিবাহ করতে গেলে প্রয়াত পূর্বরা ও তাদের প্রয়াত পিতা-মাতার জন্য, সাথে সমগ্র জীব-জগতের জন্য তর্পণ করতে হয়, কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। তর্পণ মানে খুশি করা। ভগবান শ্রীরাম লঙ্কা বিজয়ের আগে এদিনে এমনই করেছিলেন।
সেই অনুসারে এই মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন তারা তাদের পূর্বপূরূষের স্মরন করে, পূর্বপূরুষের আত্নার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করেন। সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে প্রয়াত আত্নাদের মত্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়, প্রয়াত আত্নার যে সমাবেশ হয় তাহাকে মহালয় বলা হয়। মহালয় থেকে মহালয়া। পিতৃপক্ষের ও শেষদিন এটি।

সনাতন ধর্ম অনুসারে বছরে একবার পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে পিন্ড দান করতে হয়, সেই তিথিতে করতে হয় যে তিথিতে উনারা প্রয়াত হয়েছেন। সনাতন ধর্মের কার্যাদি কোন তারিখ অনুসারে করা হয় না। তিথি অনুসারে হয়।
মহালয়াতে যারা গঙ্গায় অঞ্জলি প্রদান করেন পূর্বদের আত্নার শান্তির জন্য, তাহারা শুধু পূর্বদের নয়, পৃথিবীর সমগ্র কিছুর জন্য প্রার্থনা ও অঞ্জলি প্রদান করেন।
যে-অবান্ধবা বান্ধবা বা যেন্যজন্মনি বান্ধবা – অর্থাৎ যারা বন্ধু নন, অথবা আমার বন্ধু ও যারা জন্ম জন্মাত্নরে আমার আত্নীয় বন্ধু ছিলেন, তারা সকলেই আজ আমার অঞ্জলি গ্রহন করুন।
যাদের পুত্র নেই , যাদের কেউ নেই আজ স্মরন করার তাদের জন্য ও অঞ্জলী প্রদান করতে হয়।
যেযাং, ন মাতা, ন পিতা, ন বন্ধু – অর্থাৎ যাদের মাতা-পিতা-বন্ধু কেউ নেই আজ স্মরন করার তাদেরকে ও স্মরন করছি ও প্রার্থনা করছি তাদের আত্না তৃপ্তিলাভ করুক। সকলেই সুখি হোক ।

অনন্তকাল ধরে এই ভারতভূমির কোটি কোটি মানুষ মহালয়ার পুণ্যপ্রভাতে – ‘ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যান্ত ভুবনত্রয়ম’ – এই মন্ত্র উচ্চারণ করে তিন গন্ডুষ জল অঞ্জলি দিয়ে স্মরণ করে চলেছেন তাঁদের বিদেহী পিতৃপুরুষ এবং তাঁদের পূর্বপুরুষকে। এই মহালয়া উপলক্ষেই গয়ায় জমে ওঠে পিতৃপক্ষের মেলা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ও ভারতের বাইরে থেকে হাজার হাজার পূণ্যার্থী এই সময় গয়ায় আসেন পিতৃতর্পণ ও পিন্ডদান করতে। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে গয় নামের এক অসুরের দেহের উপর এই মহাতীর্থ স্থাপিত। তাই এই পূণ্যভূমির নাম গয়াধাম। বায়ুপুরাণে বলা হয়েছে, যাদের এখানে (গয়ায়) সপিন্ডক শ্রাদ্ধ হবে, তারা ব্রহ্মলোক গমন করুক। সকল দেবতা ও সকল তীর্থ এখানে অবস্থান করুক। কথিত আছে, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র পিতা দশরথের উদ্দেশ্যে এখানে পিন্ডদান করেণ। দশরথের প্রেতাত্না সীতাদেবীর হাত থেকে চালের অভাবে বালুকার পিন্ড গ্রহণ করেছিলেন। ফল্গুনদী, তুলসী গাছ ও অক্ষয়বট এই ঘটনার সাক্ষী ছিল। শ্রীরামচন্দ্রেই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে যখন ফল্গুনদী ও তুলসী গাছকে প্রশ্ন করেন, তখন তারা মিথ্যা কথা বলে। ফলে সীতাদেবী তাদের অভিশাপ দেন। কিন্তু অক্ষয়বট সত্য কথা বলায়, সীতাদেবী তাকে আশীর্বাদ করেন। শুধু রামায়ণে নয়, পিতৃতীর্থ গয়ার মহিমা মহাভারতেও উল্লিখিত। ভীষ্ম পিতা শান্তনুর উদ্দেশ্যে গয়াশিরে পিন্ডদান করলে পিতা তাঁকে ইচ্ছামৃত্যু বর দিয়েছিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরও স্বীয় পিতা পান্ডুর উদ্দেশ্যে এখানে পিন্ড দান করলে পিতা তাঁকে আশীর্বাদ করে বলেন, বৎস, তুমি স্বশরীরে স্বর্গগমন করতে সমর্থ হবে। স্মরণীয় ধর্মনিষ্ঠ হিন্দুরা অন্যকোনও তীর্থে যাবেন কি যাবেন না, সেটা তাঁদের মানসিকতার ব্যপার, কিন্তু পিতৃকার্য করার জন্য সকলকেই অন্তত একবার গয়াতে যেতেই হবে। এটা একটা অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

এ সম্পর্কে মহাভারতে একটি কাহিনী বর্ণীত আছে যে: প্রসিদ্ধ দাতা কর্ণের মৃত্যু হলে তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করলে, তাঁকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন, কর্ণ সারা জীবন স্বর্ণই দান করেছেন, তিনি পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কোনোদিন খাদ্য প্রদান করেননি। তাই স্বর্গে তাঁকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তাঁর পিতৃগণের সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না, তাই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে পিতৃগণকে স্বর্ণ প্রদান করেননি। এই কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়।এই কাহিনির কোনো কোনো পাঠান্তরে, ইন্দ্রের বদলে যমকে দেখা যায়।

ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যান্ত ভুবনত্রয়ম

আব্রহ্ম স্তম্ভ পর্যন্তং জগত্‍ তৃপ্যতু

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

মন্তব্য করুন

সাবমিট

© বাংলাদেশ সনাতনী সেবক সংঘ | সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

Powered by Smart Technology